
সম্পাদকীয়
সাংবাদিকদের জন্য প্রতিটি জেলায় সরকারি ভাবে আবাসন নির্মাণ করা হোক
জহিরুল হক জহির
সাংবাদিকতা সমাজের দর্পণ। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, দুর্বলতা, অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ সবার আগে যে পেশাজীবীরা তুলে ধরেন, তারা সাংবাদিক।
একজন সাংবাদিক রাত-দিন নিরলসভাবে কাজ করেন শুধু মানুষের কথা পৌঁছে দেওয়ার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই পেশাজীবীদের অধিকাংশই আর্থিক দিক থেকে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেন। তাদের অনেকের নেই স্থায়ী বাসস্থান, নেই পরিবারকে নিয়ে নিশ্চিন্তভাবে বসবাস করার পরিবেশ। তাই এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সাংবাদিকদের জন্য সরকারি আবাসন নিশ্চিত করার।
সাংবাদিকরা সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা অনলাইন মাধ্যম—যেখানেই কাজ করুন না কেন, একজন সাংবাদিক সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থেকে সত্য প্রকাশের চেষ্টা করেন। অনেক সময় তাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক হুমকি কিংবা আইনি জটিলতার মতো বিষয় নেমে আসে। তবুও সত্য তুলে ধরতে তারা পিছু হটেন না।
দুর্যোগে তারা মাঠে থাকেন। নির্বাচনকালে ঝুঁকি নিয়ে খবর সংগ্রহ করেন। দুর্নীতি বা অনিয়মের খবর প্রকাশ করে নিজের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেন। তাদের এই ভূমিকার তুলনায় প্রাপ্তি অত্যন্ত নগণ্য। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মানজনক আবাসনের ব্যবস্থা করা গেলে তা তাদের পেশাগত ত্যাগের একটি স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হবে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ সাংবাদিক বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা অনিয়মিত সম্মানীর ওপর নির্ভর করেন। অনেকেরই মাসিক নির্দিষ্ট বেতন নেই। ফলে পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। ভাড়া ও জীবনযাত্রার খরচ বহন করা তাদের জন্য বেশ কষ্টকর। আবার নিরাপত্তার দিক থেকেও তারা সবসময় ঝুঁকিতে থাকেন।
অন্যদিকে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতিটি জেলা-উপজেলায় সরকারি কোয়ার্টার রয়েছে। চিকিৎসক, শিক্ষক, পুলিশ, প্রশাসন—সবার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেও সাংবাদিকদের জন্য এধরণের কোনো সরকারি পদক্ষেপ নেই। অথচ সাংবাদিকরাও রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
যেসব কারণে সরকারি আবাসন জরুরি > (১) আর্থিক সুরক্ষা: অনেক সাংবাদিকের আয় অনিয়মিত। সরকারি আবাসনে থাকলে ভাড়া বাবদ ব্যয় কমে যাবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
(২) নিরাপত্তা: সাংবাদিকরা প্রায়ই হুমকি পান। সরকারি কলোনি বা আবাসনে থাকলে তারা নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারবেন।
(৩) মর্যাদা ও স্বীকৃতি: চিকিৎসক, পুলিশ, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সরকারি আবাসনের সুবিধা পান। সাংবাদিকদেরও একই মর্যাদা দেওয়া হলে তাদের পেশাগত আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।
(৪) পারিবারিক স্থিতিশীলতা: স্থায়ী আবাসন থাকলে পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তভাবে থাকতে পারবেন। সন্তানদের শিক্ষার পরিবেশও উন্নত হবে।
(৫) পেশাগত মনোবল: জীবনের অনিশ্চয়তা কমলে সাংবাদিকরা আরও সাহসী ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন।
সরকারের উচিত সাংবাদিক আবাসন প্রকল্প হাতে নেওয়া। প্রতিটি জেলা-উপজলা শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ করে সাংবাদিকদের জন্য ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া। ন্যায্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া তৈরি করা, যাতে প্রকৃত কর্মরত সাংবাদিকরা এই সুযোগ পান।
সুলভ শর্তে মালিকানা সুবিধা দেওয়া যেতে পারে, যাতে সাংবাদিকরা দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন।
সাংবাদিক কলোনিতে কমিউনিটি সেন্টার, পাঠাগার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র রাখা, যাতে তারা পেশাগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন।
বিশ্বের অনেক দেশেই সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। যেমন— কিছু দেশে সাংবাদিকদের আবাসনের জন্য আলাদা কলোনি বা হাউজিং স্কিম রয়েছে।
সরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও আবাসন সুবিধা দিয়ে সাংবাদিকদের সম্মানিত করা হয়।
বাংলাদেশও যদি এমন উদ্যোগ নেয়, তাহলে সাংবাদিকতার মান ও স্বাধীনতা আরও সুদৃঢ় হবে।
সাংবাদিকদের আবাসন সমাজের জন্য সুফল বয়ে আনবে। সাংবাদিকদের আবাসনের সুবিধা শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনের উন্নয়নই ঘটাবে না, বরং পুরো সমাজ উপকৃত হবে। কারণ— সাংবাদিকরা আরও নির্ভীকভাবে কাজ করতে পারবেন। জনগণের সমস্যা তুলে ধরতে আগ্রহ বাড়বে। মিডিয়ার প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
সংবিধানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সাংবাদিকদের ন্যূনতম জীবনমানের নিশ্চয়তা দেওয়া। আবাসন একটি মৌলিক চাহিদা। সরকারি উদ্যোগে সাংবাদিকদের জন্য প্রতিটি জেলায়-উপজলায় আবাসন গড়ে তোলা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
সাংবাদিকরা শুধু খবরের কাগজে লিখেন না, তারা সমাজের অন্ধকারকে আলোতে তুলে আনেন। দুর্নীতি, অন্যায়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা কলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রা যদি অনিশ্চিত থাকে, তবে এই মহৎ পেশার প্রতি অনেকে নিরুৎসাহিত হচ্ছে/হবেন। তাই এখনই প্রয়োজন প্রতিটি জেলায় সরকারি উদ্যোগে সাংবাদিকদের জন্য আবাসন নির্মাণ করা। এটি কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয়, বরং সাংবাদিকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদানের প্রতীক।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—প্রতিটি জেলায় সাংবাদিকদের জন্য সরকারি আবাসন নিশ্চিত করা হলে সাংবাদিকতা হবে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও জনকল্যাণমুখী।

