
ইতালির রাজধানী রোমে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নাগরিককে নির্মমভাবে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। নিহতরা সবাই নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা।
গত শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৯টার দিকে রোমের পশ্চিমাঞ্চলের অরেলিও এলাকার ভিয়া মন্টিগ্লিও সড়কের একটি পার্কে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পরকীয়া জনিত দীর্ঘদিনের বিরোধ দায়ী বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এই ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মো. শাহাদাত হোসেনের ছবি ও বিবরণ প্রকাশ করেছে ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিরা হলেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী আরজু (৩৮) এবং তাদের ৫ বছর বয়সী শিশু কন্যা আরিশা। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন তাদের ১৮ বছর বয়সী ছেলে অয়ন। তিনি বর্তমানে রোমের একটি হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রোমে বসবাসরত নিহতদের প্রতিবেশী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে থাকা অবস্থাতেই কামালের স্ত্রী আরজুর সঙ্গে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা শাহাদাত হোসেনের পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই অনৈতিক সম্পর্ক থেকে স্ত্রীকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়ে দুই বছর আগে কামাল উদ্দিন তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ইতালিতে পাড়ি জমান।
অন্যদিকে, প্রায় ৪ বছর আগে শাহাদাত হোসেনও তার দেশের সম্পত্তি বিক্রি করে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে পরকীয়ার বিষয়টি নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে প্রেমিকা আরজু সপরিবারে ইতালি আসার খবর পেয়ে শাহাদাতও যুক্তরাজ্য ছেড়ে ইতালিতে চলে আসেন।
স্থানীয় প্রবাসীদের বরাতে জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে রোমের বাসার পাশে একটি পার্কে স্ত্রী আরজুর পরকীয়ার বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে প্রেমিক শাহাদাতের সঙ্গে একটি বৈঠকে বসেন কামাল উদ্দিন বাবুল। এ সময় তার দুই সন্তানও সেখানে উপস্থিত ছিল। বৈঠকের একপর্যায়ে উভয়ের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
ক্ষিপ্ত হয়ে শাহাদাত ধারালো ছুরি দিয়ে একে একে আরজু, কামাল উদ্দিন ও শিশু আরিশাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে ও ছুরিকাঘাত করতে থাকেন। ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। কামালের বড় ছেলে অয়ন আহত অবস্থায় কোনোমতে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। ইতালীয় পুলিশ পার্ক থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনটি মরদেহ উদ্ধার করেছে।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি চাঞ্চল্যকর স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।”
এদিকে, এই ঘটনার পর শনিবার (২৭ জুন) ইতালীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাহাদাত হোসেনকে প্রধান সন্দেহভাজন উল্লেখ করে তার ছবি ও বিবরণ সম্বলিত একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে ১৯৮৩ সালের ১০ মে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শাহাদাতের সন্ধান বা কোনো তথ্য জানা থাকলে তা অবিলম্বে রোম কোয়েস্টের মোবাইল টিমে (৩৩৪৬৯০৩২৯৫) জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
এই বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শামসুদ্দিন হায়দার জানান, শাহাদাত হোসেন চার বছর আগে যুক্তরাজ্য যাওয়ার পর থেকে দলের কার্যক্রমের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে তার পদত্যাগ বা দল থেকে অব্যাহতির কোনো লিখিত প্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি।
শাহাদাতের বড় ভাই ও সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, ‘চার বছর আগে বাড়ির সমস্ত সম্পত্তি প্রায় ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করে পরিবার নিয়ে দেশত্যাগ করার পর থেকে শাহাদাতের সঙ্গে আমাদের পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই। আমি দুই মাস আগে দেশে এলেও তার সাথে কোনো কথা হয়নি।’
এদিকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে পৌঁছালে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহত কামালের বাবা সিরাজুল ইসলাম বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তিনি দ্রুত তার ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতনির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা কামনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও খুনি শাহাদাতের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।

