
জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নোয়াখালী জেলার সরকারি মুরগি খামার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে খামারের সংস্কারের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল না থাকায় নিয়মিত পরিচর্যা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। এর ফলে মুরগী উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কমে গেছে। বর্তমানে ৪র্থ শ্রেণির ৬টি পদের বিপরীতে মাত্র ১ জন কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন, যা দিয়ে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
১৯৮৫ সালের ১৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় এই সরকারী মুরগী প্রজনন ও উন্নয়ন খামার। যা নোয়াখালী সদর উপজেলার সোনাপুর জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন ২.৮৭ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে।
এই খামারটি একসময় প্রজনন খামার হিসেবে পরিচালিত হলেও জনবল সংকটের কারণে বর্তমানে এটি শুধুমাত্র রিয়ারিং ইউনিট হিসেবে চলছে। এখানে একদিন বয়সী বাচ্চা লালন-পালন করে, দুই মাস বয়সে প্রান্তিক খামারীদের কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা হয়।
তবে সংকটের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খামারটি ২৫ হাজার বাচ্চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জন করেছে। একই সময়ে অফিস কক্ষ সংস্কার, নতুন জলছাদ নির্মাণ এবং দুটি পুরাতন শেড সংস্কার করা হয়েছে। খামারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং খামারীদের সুবিধার্থে অনলাইনে আবেদন ও বাচ্চা বুকিং ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
স্থানীয় খামারী আবু নাসের বলেন, আমরা এখান থেকে কম মূল্যে মুরগির বাচ্চা নিয়ে লালন-পালন করে বিক্রি করে লাভবান হয়েছি। কিন্তু চাহিদা মত- সবসময় মুরগির বাচ্চা পাওয়া যায় না।
স্থানীয় আরেক খামারি মো.নুর নবী বলেন, একটাসময় আমরা এখান থেকে কম দামে মুরগির বাচ্চা নিয়ে লালন-পালন করতাম। এখন এখানে একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা পাওয়া যায় না ! এতে আমরা অন্যত্র থেকে বাচ্চা এনে লালন পালন করতে হচ্ছে। এই কারণে আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, কারণ একদিনের একটি বাচ্চা আমরা ১৫-২০ টাকায় নিতে পারতাম। কিন্তু এখন ৬০ দিনের মুরগির বাচ্চা নিতে হচ্ছে।
নুর নবী আরো বলেন, নোয়াখালীতে বিকল্প সরকারি খামার না থাকায় ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার খামারীরাও এখান থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করেন। ফলে চাহিদার চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময়- সময়মতো বাচ্চা সরবরাহ করা সম্ভব হয় না, যা বেকার যুবকদের মাঝে হতাশা সৃষ্টি করছে।

তিনি মনে করছেন, দ্রুত জনবল নিয়োগ, আধুনিক হ্যাচারি স্থাপন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে খামারটি পুরোপুরি সচল হয়ে উঠবে। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে। নুর নবী বলেন, আমরা খামারের সকল সমস্যা সমাধানে সরকারের সু-দৃষ্টি কামনা করছি। সমস্যা গুলো সমাধান করে সরকার যেনো আমাদের পাশে দাঁড়ায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, নোয়াখালী সরকারী মুরগী প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের ব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) এ কে এম ইমরান বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪০ হাজার বাচ্চা, ১ হাজার লেয়ার এবং ১ হাজার ৫০০ রিপ্লেসমেন্ট মুরগি পালনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এতে খামারীরা ভবিষ্যতে আরো বেশী লাভবান হবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের এখানে জনবল সংকট ও ইনকিউবেটর সচল না থাকার কারণে বর্তমানে প্রজনন সম্ভব হচ্ছেনা। এইজন্য বর্তমানে সরকারি অন্য খামার থেকে একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা এনে লালন পালন করে বিক্রয় করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, খামারের অবকাঠামোগত সমস্যাও কম নয়। পুরোনো ভবন ও শেডগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে, আধুনিক খাদ্য ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নেই। খামার নিচু এলাকায় হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা বর্ষা মৌসুমে মুরগি পালনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিগত বন্যায় খামারে পানি ওঠে মুরগির শেড, বাচ্চা, খাদ্য গোডাউন ও অফিস ভবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়াও সীমানা প্রাচীর দুর্বল হওয়ায় বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশে জৈব নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। খামারিদের সুবিধার্থে আমরা ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেইজ ও মোবাইল নাম্বার চালু করেছি। যাতে খামারিরা সহজে সেবা নিতে পারেন। এখানে মোট জনবল এর পদ রয়েছে ১৪টি, কিন্তু মাত্র ৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছে। জনবল ছাড়া দপ্তর চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

