
জহিরুল হক জহির >>>
বাংলাদেশের বিচার বিভাগ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ। তবে বিচারিক স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও সময়সীমা সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জগুলো এখনো প্রকট। বিচার বিভাগকে আরও স্বাধীন,জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার, জনসম্পৃক্ততা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য প্রয়োজন।
মূল চ্যালেঞ্জ:
- রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ — বিচারক নিয়োগ, বদলি, ও বাজেট বরাদ্দে নির্বাহী প্রভাব।
- মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা।
- তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা ও জনবিশ্বাসের ঘাটতি।
- বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মানবাধিকার ঝুঁকি।
প্রধান উদ্যোগ ও সংস্কার প্রস্তাব:
(১)স্বতন্ত্র বিচারিক সচিবালয়-
- আদালতের নিজস্ব প্রশাসন ও বাজেট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
- বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে নির্বাহী প্রভাব কমানো।
(২)স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নিয়োগ ব্যবস্থা-
- “Judicial Appointment Council” গঠন করে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বিচারপতি নিয়োগ।
(৩)বিচার বিভাগে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন-
- আলাদা বিচার বিভাগীয় বাজেট বরাদ্দ ও স্বাধীন তহবিল ব্যবস্থাপনা।
(৪)কেস ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল কোর্ট ব্যবস্থা-
- মামলার অগ্রগতি ট্র্যাকিং, ই-ফাইলিং, অনলাইন শুনানি— সময় ও ব্যয়ের সাশ্রয়।
(৫)জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি-
- আদালতের রায় সহজ ভাষায় প্রকাশ, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার কার্যকর করা।
- বিচার বিভাগের সংস্কারে নাগরিক পরামর্শ ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা নিশ্চিত করা।
(৬)বিচারপ্রার্থীর সুরক্ষা ও মানবাধিকার রক্ষা-
- সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ইউনিট গঠন।
- বিনামূল্যে আইনি সহায়তা ও সংবেদনশীল মামলায় গোপন বিচার প্রক্রিয়া।
ট্রানজিশন পিরিয়ড অর্ডিন্যান্সের গুরুত্ব:
- সংস্কারের প্রাথমিক ধাপ দ্রুত বাস্তবায়নে স্বল্পমেয়াদি অর্ডিন্যান্স কার্যকর হতে পারে।
- তবে তা অবশ্যই সময়সীমাবদ্ধ, সংসদীয় অনুমোদনাধীন ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ হতে হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য:
- UN Basic Principles on the Independence of the Judiciary অনুযায়ী বিচার বিভাগকে নিয়োগ, বাজেট ও প্রশাসনে সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে হবে।
- ভারত, নেপাল ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে বিচারিক সচিবালয় ও নিয়োগ কাউন্সিল সফলভাবে চালু রয়েছে— বাংলাদেশের সংস্কারে এগুলোর আদল অনুসরণযোগ্য।
প্রত্যাশিত ফলাফল:
- বিচার বিভাগে আস্থা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি।
- মামলার নিষ্পত্তির সময় ৩০-৪০% পর্যন্ত হ্রাস।
- ন্যায়বিচারের সমান সুযোগ ও মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত।
- আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা।
নীতিগত বার্তা:
👉 বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা একে অপরের পরিপূরক।
👉 সংস্কার সফল হবে কেবল তখনই, যখন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ একসাথে কাজ করবে।
বাংলাদেশে বিচার বিভাগ সংস্কার: ৩/৬/১২ মাস মেয়াদী অ্যাকশন রোডম্যাপ :
বিচার বিভাগকে আরও স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও জনগণমুখী করা, এবং বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা ও সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
পর্যায়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা
| সময়সীমা | মূল কার্যক্রম | দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা/পক্ষ | প্রত্যাশিত ফলাফল |
| প্রথম ৩ মাস (তাৎক্ষণিক ধাপ) | – বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন। – বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রণয়ন। – ট্রানজিশন অর্ডিন্যান্সের খসড়া প্রস্তুত। – প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপের প্রাথমিক বাস্তবায়ন কমিটি গঠন। |
আইন মন্ত্রণালয়, সুপ্রিম কোর্ট, সংসদ সচিবালয় । | প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের ভিত্তি তৈরি, দ্রুত সংস্কারের সূচনা। |
| ৬ মাসের মধ্যে (মধ্যম মেয়াদ) | – Judicial Appointment Council- চালু। – বাজেট স্বায়ত্তশাসনের রোডম্যাপ প্রকাশ। – ডিজিটাল কেস। ম্যানেজমেন্ট ও ই-ফাইলিং সিস্টেম চালু। – বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা ইউনিট (Witness Protection Cell) গঠন। – RTI ও তথ্যপ্রকাশ নির্দেশিকা চূড়ান্ত। |
সুপ্রিম কোর্ট, আইন মন্ত্রণালয়, তথ্য কমিশন, অর্থ মন্ত্রণালয়। | স্বচ্ছ নিয়োগ, আর্থিক স্বাধীনতা ও তথ্য-স্বচ্ছতা কার্যকর। |
| ১২ মাসের মধ্যে (দীর্ঘমেয়াদি ধাপ) | – বিচারিক সচিবালয় সম্পূর্ণরূপে কার্যকর। – বিচারকদের বদলি/পদোন্নতির নিয়ম বাস্তবায়ন। – বার্ষিক পারফরম্যান্স রিপোর্ট প্রকাশ। – জনমত জরিপ ও সংস্কারের প্রভাব মূল্যায়ন। – সংস্কারগুলোকে সংসদীয় অনুমোদন দিয়ে স্থায়ী আইন রূপে প্রণয়ন। |
সংসদ, প্রধান বিচারপতি, সিভিল সোসাইটি, বার কাউন্সিল। | পূর্ণ প্রশাসনিক স্বাধীনতা, জবাবদিহিমূলক বিচার ব্যবস্থা, জনআস্থা বৃদ্ধি। |
“সহায়ক উপাদান সমুহ”
- প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন: বিচারক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ (বিচারনৈতিক নীতি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার)।
- জনসম্পৃক্ততা: নাগরিক সমাজ, আইনজীবী সমিতি ও গণমাধ্যমের সঙ্গে অংশীদারিত্বমূলক সংলাপ।
- মনিটরিং ও মূল্যায়ন কাঠামো: সংস্কার অগ্রগতির পরিমাপের জন্য ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন ও সূচকভিত্তিক মূল্যায়ন।
-সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও প্রতিরোধ কৌশল-
| চ্যালেঞ্জ | ঝুঁকি | প্রতিরোধ কৌশল |
| রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। | নির্বাহী কর্তৃত্বের প্রভাব। | সংসদীয় তদারকি ও স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে ভারসাম্য। |
| প্রশাসনিক জটিলতা। | সিদ্ধান্তে বিলম্ব। | নির্দিষ্ট সময়সীমা ও KPI নির্ধারণ। |
| বাজেট সীমাবদ্ধতা। | পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব। | আন্তর্জাতিক সহযোগিতা (UNDP, JICA ইত্যাদি)। |
| পরিবর্তনের প্রতিরোধ। | অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ। | ধারাবাহিক পরামর্শ ও স্টেকহোল্ডার সম্পৃক্ততা। |
সাফল্যের পরিমাপক সূচক (Key Indicators)
- মামলার গড় নিষ্পত্তি সময় ৩০-৪০% হ্রাস।
- বার্ষিক জনআস্থা সূচকে উন্নতি।
- বিচার বিভাগীয় বাজেটের স্বায়ত্তশাসন অর্জন।
- RTI আবেদন নিষ্পত্তি হার ৯০% ।
- স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব নতুন বিচারপতি নিয়োগ।
এই রোডম্যাপ বাস্তবায়িত হলে বিচার বিভাগ প্রশাসনিকভাবে স্বাধীন হবে, নাগরিক আস্থা বৃদ্ধি পাবে, এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মানবাধিকারসম্মত একটি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

