
জহিরুল হক জহির:
বিচার বিভাগকে আরও স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ, আদালত কীভাবে বহিরাগত প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করবে ও বিচারপ্রার্থীর সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, বিচারিক স্বাধীনতার গুরুত্ব জনগণের কাছে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন এবং ইতিবাচক জনমত গঠন, টেকসই ও অর্থবহ সংস্কার নিশ্চিতে ট্রানজিশন পিরিয়ড অর্ডিন্যান্সের মতো ব্যবস্থার গুরুত্ব, বিচার ব্যবস্থার সংস্কারে নাগরিকদের অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচারে সমান সুযোগ, বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা, সময়সীমা কমানো, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের সুরক্ষা, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, প্রস্তাবনাগুলো এবং প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপ ইত্যাদি নিয়ে বাস্তবিক ও উল্লেখযোগ্য বিশ্লেষণ গুলো এই প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
উদ্দেশ্যসমূহ :
- বিচারাধীন কোনো মামলায় বিচারক বা প্রশাসন যাতে বহিরাগত চাপ বা প্রভামূলক হস্তক্ষেপে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা (অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুটোই)।
- বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা, সমান সুযোগ ও মানবিক মর্যাদা বজায় রাখা।
- ন্যায়প্রাপ্তির গতি ও কার্যকারিতা বাড়ানো, অনর্থক বিলম্ব কমানো।
- জনগণের বিশ্বাস (Public Trust) তৈরি করে বিচারব্যবস্থাকে সহজবোধ্য ও স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা।
প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো :
- রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রন ও অজানা সিদ্ধান্ত-মেকিং — উচ্চ আদালত ও নীচু আদালতের নিয়োগ/পোস্টিং-এ কার্যত নির্বাহী ও ক্ষমতানির্ভর দিকপাত।
- প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা — বিচার বিভাগের বাজেট, কর্মী নিয়োগ, কোর্ট-অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে কার্যকর স্বাধীনতা নেই।
- ন্যায়প্রার্থীর নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা — অনেক ক্ষেত্রে তথ্য অপ্রতুল ও গোপনীয়তা/সুরক্ষা দ্বন্দ্ব।
- সংস্কারের সময় রাজনীতি — ট্রানজিশন পিরিয়ডে অর্ডিন্যান্স/হট-রুল প্রয়োগ করলে তা যৌক্তিক হলেও গ্যারান্টি ছাড়া থাকলে কিয়দংশে গণতান্ত্রিক স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
আদালতকে বহিরাগত প্রভাবমুক্ত রাখার ব্যবস্থা :
*স্বতন্ত্র বিচারিক সচিবালয় (Judicial Secretariat) — আদালত নিজস্ব প্রশাসন ও বাজেট নিয়ন্ত্রণ করবে, পোস্টিং/পদোন্নতি প্রশাসনেও বিচার বিভাগের অঙ্গীকার থাকবে, ফলে প্রশাসনিক মধ্যস্থতা কমে যাবে। এই নীতি রেকোমেন্ড করা হয়েছে ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
*স্বাধীন নিয়োগ কাউন্সিল — বিচারপতি নিয়োগে বহিরাগত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কমাতে সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ নিয়োগ বিধি ও মিশ্র-কাউন্সিল (যেখানে বিচারপতিরা বড় অঙ্কে থাকবেন) দরকার — সাম্প্রতিক ‘Supreme Court Judge Appointment Ordinance, 2025’এর ধারণা দেখুন।
*আর্থিক স্বায়ত্তশাসন — বিচার বিভাগের বাজেট সরাসরি সংসদীয় অনুমোদনের পরে বিচারালয়ে বরাদ্দ, আলাদা সার্বিক হিসাব-বহির্ভূত নিবেদিত তহবিল।
*পোস্টিং/ট্রান্সফার রুলস ও আপিলযোগ্য নীতি — স্পষ্ট রুলের মাধ্যমে বদলি ও পোস্টিং-এ স্বচ্ছতা, অনুপ্রবেশ এড়াতে নিয়োগের নীতিবহিরতা। (CJ রোডম্যাপে এ দিকের জোর দেয়া)।
*পেশাগত মানদণ্ড ও নৈতিকতা — বিচারবহরকে দক্ষতাভিত্তিক টিউশন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, শাস্তিমূলক/শৃঙ্খলা বিধি সুদৃঢ় করা।
বিচারপ্রার্থীর সুরক্ষা ও মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ :
- সীমিত-এবং নিয়ন্ত্রিত সরকারি হস্তক্ষেপ: তদন্ত/গ্রেপ্তার/রিমাণ্ড-নির্দেশ ইত্যাদিতে আদালতকে স্বাধীনভাবে তত্ত্বাবধান করা।
- নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা:ভুক্তভোগী বা প্রমাণ-উপস্থিতির সুরক্ষার জন্য কোর্ট-প্রোটেকশন ইউনিট এবং গোপন বিশ্লেষণ পদ্ধতি।
- বিনামূল্যে আইনি সহায়তা (Legal aid): দরিদ্র ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত আইনসেবা।
- মানবাধিকার মনিটরিং:সালিশি-ঘটনার ক্ষেত্রে স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থার রোল নিশ্চিত করা। (আন্তর্জাতিক নীতিতে এটাই সুপারিশ)।
স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ও জনসম্পৃক্ততা :
- রায়ে ও নীতিতে প্রকাশ্যতা: সব উচ্চ আদালত-রায় অনলাইন-অভিগম্য, ন্যূনতম সংবেদনশীল অংশ বাদে বিচারবৃত্ত বা কর্মপ্রক্রিয়া-নথি সচিত্রভাবে প্রকাশ করা।
- RTI/তথ্যপ্রাপ্তি-অধিকার: কোর্ট-অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্পর্কিত প্রশাসনিক তথ্য RTI-অধিকারসমেত করতে হবে, তবে বিচারিক স্বাধীনতা বজায় রেখে সীমাবদ্ধতা কেবল-নির্দিষ্ট ও ন্যূনতম।
- সিদ্ধান্তের সহজ ভাষ্য (Plain-Language Summaries): সাধারণ জনগণের জন্য রায়ের সারাংশ সহজ ভাষায় বাংলায় প্রকাশ করা, এতে জনমত গঠনে সাহায্য করবে।
- সিটিজেন ফোরাম ও পরীক্ষণ (Public Consultations): নীতিনির্ধারণের আগে জনপরামর্শ ও বার অ্যাসোসিয়েশন, সিভিল সোসাইটি-কে অন্তর্ভুক্ত করা।
ট্রানজিশন পিরিয়ড অর্ডিন্যান্সের গুরুত্ব ও ঝুঁকি :
- কেন জরুরি: দ্রুত অন্তর্নিহিত কাঠামো বদলাতে অস্থায়ী আইন (Ordinance) কার্যকর, বিশেষত যখন পুরাতন নিয়োগ/বাজেট/অ্যাডমিন কাঠামো দ্রুত বদল করা দরকার। বাংলাদেশে ২০২৫-এ এমন কিছু অর্ডিন্যান্স লক্ষাণীয় ছিল যা নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিবর্তন করেছে।
- ঝুঁকি: অর্ডিন্যান্স দীর্ঘস্থায়ী হলে বা গণসম্মত ছাড়াই প্রচলিত হলে তা গণতান্ত্রিক বৈধতা ও ধারাবাহিকতা ক্ষুন্ন করতে পারে। এজন্য ট্রান্সিশন-অ্যাকশনকে স্বল্পকালীন, নির্দিষ্ট, স্পষ্ট সময়সীমা ও সাংবিধানিক পর্যবেক্ষণের অধীন রাখতে হবে।
কমিশন-রিপোর্ট এবং প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপ ও বাস্তবিক বিশ্লেষণ:
- কি বলছে কমিশন:বিচার বিভাগ সম্পর্কিত যত বড় পরিবর্তন দরকার (৩২টি সাংবিধানিক ধারায় সংশোধন, জেলা/উপজেলা স্তরের কোর্ট পুনরায় বিন্যাস, স্থায়ী হাই কোর্ট বেঞ্চ, স্বাধীন তদন্ত সংস্থার সুপারিশ ইত্যাদি), এগুলো প্রস্তাবিত হয়েছে এবং রিপোর্ট সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
- প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপ: ২০২৪-২০২৫ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি রোডম্যাপে বিচারিক সচিবালয় আলাদা করা, পোস্টিং-রুলস, জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্তৃপক্ষ, কেস-ম্যাক্যানেজমেন্ট ও আইসিটি-ভিত্তিক দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তাব করেছেন, এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে স্বাধীনতা ও দক্ষতা দুটোই বাড়বে।
- বাস্তবিক মূল্যায়ন: রিপোর্ট ও রোডম্যাপ কৌশলের দিক থেকে শক্ত , তবে সফলতা নির্ভর করবে: (ক) রাজনৈতিক পরিবেশে বাস্তব প্রয়োগ-ইচ্ছা, (খ) প্রশাসনিক সক্ষমতা ও বাজেট, (গ) স্বচ্ছতা ও জনগণীয় পরামর্শকে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর। সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে পারদর্শিতা ও মানবাধিকার-ভিত্তিক বিচার করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ভাল চর্চার সঙ্গে তুলনা:
- UN Basic Principles on the Independence of the Judiciary: নিয়োগ, নিরাপত্তা (Security of Tenure), যথাযথ বিচারের অধিকার, এবং স্বাধীনতা-সংক্রান্ত মৌলিক নীতির ওপর জোর দেয়, এগুলো বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- বিভিন্ন দেশের ভাল উদাহরণ:
- স্বতন্ত্র বিচারিক সচিবালয়– অনেক দেশের (যেমন: ভারতের সুপারিশভিত্তিক প্রস্তাব, কয়েকটি আফ্রিকান ও এশীয় দেশের অনুশীলন) আদালত-অ্যাডমিনকে স্বতন্ত্র করা হয়েছে, যাতে প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতা আসে।
- স্বতন্ত্র নিয়োগ কাউন্সিল: ইউরোপীয় নীতিমালা ও অনেক উন্নত দেশের চর্চা অনুযায়ী, নিয়োগে বৈশ্বিকভাবে পিয়ার-রিভিউ, স্বচ্ছ শর্ত ও কেশনের নিবন্ধন পদ্ধতি আছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অর্ডিন্যান্স এই পথের প্রথম পদক্ষেপ।
প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সুপারিশ (প্রায়োগিক, অগ্রাধিকারক্রমে):
- অল্পকালীন (Transitional) আইন যথাযথভাবে নির্ধারিত রাখুন: অর্ডিন্যান্স দিলে সেটি স্পষ্ট সময়সীমা ও সংসদীয় সমর্থন নিশ্চিত করুন, মানবাধিকার চেক-অ্যান্ড-ব্যালান্স বজায় রাখতে সুপ্রিম কোর্ট-রিভিউ নিশ্চিত করুন।
- একটি স্বতন্ত্র Judicial Secretariat দ্রুত প্রতিষ্ঠা: প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রন ও বাজেট-স্বাধীনতা দ্রুত বাস্তবায়ন করুন।
- নিয়োগ-কাউন্সিলের স্থায়িত্ব ও স্বচ্ছতা: পরিষ্কার মানদণ্ড, প্রকাশ্য হওয়ার নিয়ম, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ও রেকর্ড প্রকাশ।
- কেস-ম্যাক্যানেজমেন্ট ও আইসিটি: ডিজিটাল কেস-লাইব্রেরি, রিমোট-হিয়ারিং, সময়-সীমা ট্র্যাকিং,এতে মামলার বিলম্ব কমবে।
- আইনি সহায়তা ও কোর্ট-প্রোটেকশন শক্তিশালী করা : মানসম্মত প্রোভাইডার ও ট্রেনিং, ভুক্তভোগী সেফটি প্রটোকল।
- রায়-সংক্ষরণ ও সাধারণ ব্যাখ্যা (plain language): জনগণের আস্থাকে বাড়ায়, RTI-সামঞ্জস্য রেখে কোর্টের প্রশাসনিক নথি শেয়ার করা।
- স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন সূচক (KPIs): কত শতাংশ কেস সময়মতো নিষ্পত্তি, আপিলের অনুপাত, জনসম্মান সূচক ইত্যাদি মাপার জন্য প্রকাশ্য মেট্রিক্স।
বাস্তবিক বাধা-ঝুঁকি ও মোকাবিলা :
- রাজনৈতিক প্রতিরোধ: শক্তিশালী রেজিস্ট্যান্স হলে ধাপে ধাপে (Quick Wins + Medium-Term, সংস্কার) কৌশল নিন। প্রথমে প্রশাসনিক স্বাধীনতা (সচিবালয়, পোস্টিং-রুল) এনে সহজ করার পরে সাংবিধানিক সংশোধন।
- ক্যাপাসিটি-সঙ্কট: প্রশিক্ষণ ও ম্যানেজমেন্ট-শক্তি বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহায়তা (UNDP ইত্যাদি) গ্রহণ।
- আইনি বৈধতার প্রশ্ন: অর্ডিন্যান্স/রুলস যেন কেবল অস্থায়ী না থেকে সাংবিধানিক পথে নিশ্চিত করা যায়, সংসদীয় মান্যতা প্রয়োজন।
পরিমাপক সূচক (কি দেখে বলবেন সফল):
- বিচার-স্বাধীনতা সূচক (পিয়ার-সমীক্ষা ও আন্তর্জাতিক সূচক) বছরে উন্নতি।
- মামলার গড় মেয়াদ কমে আসে (শতাংশ দ্বারা)।
- জনসাধারণের আস্থার দিকে নজর দেয়া, বার্ষিক জনমত জরিপে বৃদ্ধি।
- RTI অনুরোধে বিচারালয় প্রশাসনিক তথ্যের জবাবদিহিতা ও সময়মতো প্রকাশ।
উপসংহার:
বাংলাদেশের চলতি কমিশন-রিপোর্ট ও প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপ বাস্তবিকভাবে শক্তিশালী ও চূড়ান্ত হওয়া সম্ভব এমন একটি রূপরেখা দিচ্ছে, যেখানে স্বতন্ত্র সচিবালয়, নিয়োগ-পদ্ধতির স্বচ্ছতা, বাজেট-স্বাধীনতা, এবং কেস-ম্যানেজমেন্ট হলো মূল স্তম্ভ। তবে পার্থক্য গড়বে বাস্তব রাজনীতিক ইচ্ছা, সংসদীয় বৈধতা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (UN Basic Principles) এখানে পথপ্রদর্শক, ট্রানজিশনাল অর্ডিন্যান্স ব্যবহার করা যেতে পারে , কিন্তু তা সংক্ষিপ্ত, মনিটরযুক্ত ও সাংবিধানিক রূপে রূপান্তর নিশ্চিত করে নেওয়া প্রয়োজন।

