
কাজীদের কাবিন ব্যবসা: একটি সামাজিক ও ধর্মীয় গবেষণা
🔹 ভূমিকা:
বাংলাদেশে ইসলামী বিবাহের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় “কাজী” একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইসলামী শরীয়ত ও রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী, কাজীর দায়িত্ব হচ্ছে বিবাহের সাক্ষী থাকা, কাবিননামা যথাযথভাবে রেজিস্ট্রেশন করা এবং দম্পতির অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে— এই ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্বকে অনেক কাজী “ব্যবসা” হিসেবে ব্যবহার করছেন। এ গবেষণায় সেই কাবিন ব্যবসার বাস্তবতা, কারণ, প্রভাব ও সমাধানের দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে
🔹 গবেষণার উদ্দেশ্য:
১. কাজীদের কাবিন ব্যবসার প্রকৃতি ও ধরন নির্ণয় করা।
২. এর সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব বিশ্লেষণ করা।
৩. সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।
🔹 তথ্যসূত্র ও পদ্ধতি:
এই গবেষণায় ২০২৩–২০২৪ সালে ঢাকা, কুমিল্লা, ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ৩৫ জন নারী-পুরুষ, ৫ জন কাজী ও ২ জন স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এছাড়া ইসলামিক ফিকহ, বাংলাদেশ মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ এবং স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিবেদনসমূহ পর্যালোচনা করা হয়।
🔹 গবেষণার ফলাফল:
১️⃣ কাবিন ব্যবসার প্রকৃতি-
অতিরিক্ত ফি গ্রহণ: সরকারি নির্ধারিত ফি ৫০০–৮০০ টাকার জায়গায় অনেক কাজী ৫,০০০–১০,০০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন।
ভুয়া কাবিননামা তৈরি: অনুমোদিত রেজিস্ট্রেশনবিহীন বা অন্য এলাকার নামে কাবিন রেজিস্ট্রেশন করা হচ্ছে।
গোপন বিয়ে বৈধ করার মাধ্যম: অনেক প্রেমিক যুগল বা বিবাহিত পুরুষ “গোপন কাবিননামা” তৈরি করে দ্বিতীয় বিয়েকে লুকিয়ে রাখছেন।
তারিখ পরিবর্তন বা জাল কাগজ: তালাক বা পুনর্বিবাহের সুবিধার্থে কাবিনের তারিখ বা সাক্ষীর নাম জাল করা হয়।
২️⃣ কারণসমূহ:
আইনি তদারকির দুর্বলতা: স্থানীয় প্রশাসন বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ কার্যকর নয়।
ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব: অনেকেই জানেন না, কাজী ফি নির্ধারণে সীমা অতিক্রম করতে পারেন না।
অর্থনৈতিক লোভ: সরকারি পদ হলেও কাজীর উপার্জনের সুনির্দিষ্ট কাঠামো না থাকায় বাণিজ্যিক প্রবণতা তৈরি হয়।
গোপন বিয়ে করার সামাজিক প্রবণতা: সমাজের লজ্জা বা সামাজিক চাপে মানুষ গোপন কাবিন করতে চায়।
৩️⃣ সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব:
নারীর অধিকার ক্ষুণ্ন হয়: ভুয়া বা গোপন কাবিনের কারণে মোহরানা ও ভরণপোষণ দাবি করা কঠিন হয়।
আইনগত জটিলতা বাড়ে: একই নারীর নামে একাধিক কাবিননামা তৈরি হয়, যা আদালতে জটিলতা সৃষ্টি করে।
ধর্মীয় অবক্ষয়: নিকাহকে পবিত্র দায়িত্বের পরিবর্তে আয়ের উৎসে পরিণত করা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী।
বিশ্বাসহীনতা সৃষ্টি: সমাজে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কাজীদের প্রতি আস্থা কমে যায়।
🔹 বিশ্লেষণ:
গবেষণার মাধ্যমে দেখা যায়, কাবিন ব্যবসা শুধু ব্যক্তিগত লোভ নয়; এটি একটি গঠনমূলক প্রশাসনিক দুর্বলতার ফলাফল। আইন থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় কাজীরা ইচ্ছামতো ফি নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা এ থেকে কমিশন পান, ফলে অনিয়মে নীরব সমর্থন তৈরি হয়।
🔹 সমাধান√✓
১. অনলাইন কাবিন রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম চালু করা — যাতে কাজীর আর্থিক স্বচ্ছতা ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়।
২. কাজীদের প্রশিক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ — ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া।
3. অতিরিক্ত ফি বা ভুয়া কাবিনে শাস্তি নিশ্চিত করা — আইন অনুযায়ী জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিল করা।
4. জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা — নারীদের ও অভিভাবকদের জানাতে হবে, সরকারি রেজিস্ট্রারে কাবিনই বৈধ।
5. ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার — বিয়ে ব্যবসা নয়, ইবাদত—এই ধারণা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
🔹 উপসংহার:
কাজীর দায়িত্ব হচ্ছে সমাজে নৈতিকতা, সততা ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু যখন সেই দায়িত্ব বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিণত হয়, তখন বিবাহ নামক পবিত্র বন্ধনটি অবমূল্যায়িত হয়। তাই “কাজীদের কাবিন ব্যবসা” রোধ করা শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্বও বটে।
সচেতন নাগরিক ও সৎ প্রশাসনের যৌথ প্রয়াসই পারে এই অনিয়মের অবসান ঘটাতে।

