সম্পাদকীয়
পাঠ্যপুস্তকে জীবনমুখী শিক্ষার সময় এখনই
(লেখক: জহিরুল হক জহির)
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা বা সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি একজন মানুষকে সচেতন, দায়িত্বশীল, নৈতিক ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় এখনও এমন অনেক জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও পাঠ্যক্রমে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী একাডেমিকভাবে দক্ষ হলেও বাস্তব জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারে না।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে।
তাই সময়ের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাক্রমেও পরিবর্তন আনা জরুরি। এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি জীবনকে সুন্দর, নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনার শিক্ষা থাকবে।
শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া উচিত। ট্রাফিক আইন মানার গুরুত্ব, রাস্তা পারাপারের নিয়ম, মোটরসাইকেল বা অন্যান্য যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
একজন সচেতন পথচারী ও দায়িত্বশীল চালক তৈরি করতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে ভদ্রতা, সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলাবোধ, সহনশীলতা, অন্যের প্রতি সম্মান, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার মতো মূল্যবোধও পাঠ্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে সুন্দর মানুষের মাধ্যমে, আর সুন্দর মানুষ তৈরি হয় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টায়। বিদ্যালয়ে নিয়মিত এসব বিষয়ে অনুশীলন শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এর অপব্যবহার নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করছে। ভুয়া তথ্য, গুজব, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
তাই শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীলভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব, অনলাইন নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল নাগরিকত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রযুক্তির সুফল তখনই পাওয়া সম্ভব, যখন এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
নেশাজাতীয় দ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা থাকা প্রয়োজন। মাদক শুধু একজন মানুষের স্বাস্থ্যই ধ্বংস করে না, তার পরিবার, কর্মজীবন ও সামাজিক অবস্থানকেও বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। অনেক অপরাধের পেছনেও মাদকের প্রভাব দেখা যায়।
তাই মাদকের ক্ষতি, এর সামাজিক ও আইনি পরিণতি এবং সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্ব পাঠ্যবইয়ে বয়স-উপযোগীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। সচেতনতা তৈরি হলে তরুণ প্রজন্ম ভুল পথে যাওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
একইভাবে পারিবারিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দাম্পত্য জীবনে বিশ্বস্ততা, আত্মসংযম এবং দায়িত্ববোধের গুরুত্ব সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের বয়স-উপযোগী শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে।
সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক সমাজের স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।
পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান ও দায়িত্ববোধের অভাব পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং এর প্রভাব শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশেও পড়তে পারে। তাই পারিবারিক সম্পর্কের ইতিবাচক মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলতে সহায়ক হবে।
এছাড়া প্রাথমিক চিকিৎসা, অগ্নিকাণ্ড বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে করণীয়, জরুরি নম্বরে যোগাযোগের পদ্ধতি, স্বাস্থ্যবিধি, পুষ্টি, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব, আর্থিক সচেতনতা, সঞ্চয়ের অভ্যাস এবং নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কেও মৌলিক ধারণা শিক্ষার্থীদের দেওয়া উচিত।
এসব বিষয় একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি কাজে লাগে এবং আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করে।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় জীবনদক্ষতা বা লাইফ স্কিলস শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলই করছে না, বরং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও দক্ষ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশেও এই ধরনের জীবনমুখী শিক্ষাকে আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার এখনই উপযুক্ত সময়।
অবশ্যই এসব বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বয়স, মানসিক বিকাশ এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে। বিষয়গুলো এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা ভয় নয়, সচেতনতা, নৈতিকতা এবং ইতিবাচক জীবনবোধ অর্জন করতে পারে। শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি আধুনিক, মানবিক ও জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশকে একটি উন্নত, নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার পরিধি শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এমন শিক্ষার প্রয়োজন, যা একজন শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নাগরিক, নেতৃত্ব ও জাতির চালিকাশক্তি।
তাই তাদের হাতে এমন শিক্ষা তুলে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব, যা জ্ঞান, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি প্রজন্ম গড়ে তুলবে। পাঠ্যপুস্তকে জীবনমুখী শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি তাই আর বিলম্বের নয়—সময়ের অপরিহার্য দাবি।