টানা ছয় ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবে গেছে জেলা শহর মাইজদী। শহরের প্রায় ৬৫-৭০ ভাগ এলাকা বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে। পানি উঠেছে অনেক অফিস এবং বাড়িঘরে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন বিভিন্ন অফিসে আসা সেবা গ্রহীতারাও। মঙ্গলবার (২ জুলাই) সকাল পর্যন্ত টানা এ বৃষ্টি হয়। এসময় ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে আবহাওয়া অফিস।

সরেজমিনে দেখা যায়, পানিতে পুলিশ সুপার কার্যালয়, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে ডুকেছে পানি। পানিতে ডুবে গেছে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জনের বাসভবনের একমাত্র সড়কও।

এছাড়া পানি প্রবেশ করেছে আবহাওয়া অফিস, জেলা মৎস্য অফিস সহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি অফিসে। পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আসা একজন সেবাপ্রার্থী সামছুন্নাহার বলেন, এ যেন এক আজব শহর। এমন বাজে পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়িনি। পুলিশ সুপার কার্যালয়ের নিচতলা সম্পূর্ণ পানিতে ডুবে গেছে। অল্প বৃষ্টিতে এমন অবস্থা। এতে বুঝা যায় এ শহর বসবাসের অযোগ্য। মাইজদি হাউজিংয়ের বাসিন্দা ছিদ্দিক বলেন, সড়কের থেকে ড্রেনের উচ্চতা বেশি। তাই পানি উল্টো রাস্তায় আসে। বেশিরভাগ ড্রেনের মুখ বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া ডুবে গেছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়ক। এতে বাসিন্দারা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় জেলা শহর মাইজদীতে ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারী বর্ষণের ফলে আমার অফিস ও সড়ক ডুবে গেছে। আমিও জলাবদ্ধতায় আটকে আছি।
এটি চলতি বর্ষা মৌসুমে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। আর গত ২৪ ঘণ্টায় সকাল ছয়টা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ১০৯ মিলিমিটার। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আরও কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
শহরের লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকা, নোয়াখালী সরকারি কলেজ, হরিনারায়ণপুর, কৃষ্ণরামপুর, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, সরকারি মহিলা কলেজ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকার বেশির ভাগ সড়ক বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে।
সড়কের আশপাশের বাসাবাড়ির আঙিনায় বৃষ্টির পানি জমে আছে। বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে শহরের সেন্ট্রাল রোডের বিভিন্ন অংশ, হাকিম কোয়ার্টার সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ শহরের বাসিন্দারা চলাচলে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
শহরের লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার বাসিন্দা ফারুক বলেন, পৌরসভা কর্তৃপক্ষ সড়কের পাশে যে ড্রেন করেছে সেটি ভারী বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে উপযুক্ত নয়।
সরু ড্রেন এমনিতে ময়লা, আবর্জনায় প্রায় সময় ভরাট হয়ে থাকে। তার ওপর একটু বেশি বৃষ্টি হলে ড্রেনগুলো বৃষ্টির পানির চাপ নিতে পারে না। এতে ড্রেনের পানি উপচে পড়ে আশপাশের বাড়িতে। মানুষ বাধ্য হয়ে ওই নোংরা পানিতে চলাচল করতে হয়।
বছিরার দোকান এলাকার সৈয়দ বাড়িতে দেখা যায়, পুরো বাড়িতে প্রায় হাঁটুসমান পানি। বাড়ির বাসিন্দারা জানান, বছরের সাত-আট মাস তাঁদের বাড়ি পানিতে ডুবে থাকে। বৃষ্টির পানি নামার কোনো ড্রেন নির্মাণ করেনি পৌরসভা। বাসিন্দাদের যাতায়াতের সড়কও নেই। পৌরসভায় যোগাযোগ করলে বলে, বরাদ্দ নেই। এভাবেই বছরের পর বছর তাঁরা কষ্টে কাটাচ্ছেন। কেউ তাঁদের দুর্ভোগ দেখে না।
হাঁটুপানি মাড়িয়ে বাড়ি ফেরার পথে কথা হয় শহরের মহিলা কলেজ এলাকার বাসিন্দা সাহাদাত হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুর্ভোগ তাঁদের নিত্যসঙ্গী। একটু বৃষ্টিতেই তাঁদের বাড়িতে পানি ওঠে। পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টির পানি মাড়িয়ে পুরুষেরা কোনো রকম চলাচল করতে পারলেও পরিবারের নারী ও শিশুদের বেশি কষ্ট হয়। অল্প বৃষ্টিতেই তাঁদের দুর্ভোগ নেমে আসে।
জেলা মৎস্য অফিসের সামনে মো. রায়হান বলেন, অফিসের মধ্যে মাছ চাষ করা যাবে। পুরোনো জেলা শহরে যদি এ অবস্থা হয় তাহলে আমাদের বলার কিছু থাকে না। যারা ভোগান্তিতে পড়েছে তারাই বুঝবে কতো কষ্ট।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মচারী মো. তারেক বলেন, ডিসি স্যারের বাংলোর সামনের সড়কে পানি উঠে গেছে। আমি এক রুমে থাকি সেখানেও পানি। আরেকটু বৃষ্টি হলে বাংলোতেও পানি ঢুকবে। এক ভয়াবহ অবস্থার ভেতরে আছি।
নোয়াখালী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সুজিত বড়ুয়া বলেন, শহরের প্রধান সড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগ নির্মিত ড্রেনটির ওপরের স্ল্যাব ঢালাই করা থাকায় তাঁরা পরিষ্কার করতে পারছেন না। এ কারণে পানি নিষ্কাশনে সমস্যা বেশি হচ্ছে। তা ছাড়া শহরের পানি যে গাবুয়া খাল সহ অন্যান্য খালে গিয়ে পড়ে, সেগুলোর পানিও উপচে পড়ছে। এ কারণে শহরের পানি সরছে ধীরগতিতে।
তবে পৌরসভার ড্রেনেজ–ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই কর্মকর্তা।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. ইব্রাহিম বলেন, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের নিচ তলায় আমার অফিসে পানি। বসা তো দূরে থাক অফিসে ঢোকাই যাচ্ছেনা। দাপ্তরিক কাজ বন্ধ রেখে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরাতে ব্যস্ত অফিস স্টাফরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সি আমির ফয়সাল বলেন, জলাবদ্ধতা রোধে শহর ও আশপাশের ১৬১ কিলোমিটার খাল খনন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সঙ্গে সঙ্গে নোয়াখালী খালও খনন করা হয়েছে। যেটা নোয়াখালীর দুঃখ ছিল। তবে পুরোপুরি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে ড্রেন ও নালা রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।
নোয়াখালী পৌরসভার মেয়র সহিদ উল্যাহ খান বলেন, একটানা অধিক পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার বিষয়ে তিনি অবগত রয়েছেন। সরকারি অফিস সহ বিভিন্নস্থানে জলাবদ্ধতার ফলে ভোগান্তির বিষয়ে আমি খবর পেয়েছি। আসলে ড্রেনগুলো পরিষ্কার না থাকায় এমন হয়েছে। পৌরসভার কর্মীরা কাজ করছে।
বিষয়টি নিয়ে তিনি এরই মধ্যে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। তাঁরা ড্রেনগুলো পরিষ্কার করে দেওয়া সহ দ্রুত পানি নিষ্কাশনে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। এ ছাড়া শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সেটি বাস্তবায়ন করা হলে এ সমস্যা আর থাকবে না।